ছবি সংগৃহীত
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : আজ ৫ মে। ২০১৩ সালের এই দিনে রাজধানী ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে তৎকালীন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা ‘অভিযান’ চালান, যা দেশের ইতিহাসে মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক মর্মান্তিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই দিনটি মূলত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতিবাদ হিসেবে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন স্মরণ করে থাকে এবং দিনটিকে হেফাজতে ইসলাম প্রতিবছর শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ২০১৩ সালের যৌথ বাহিনীর ওই অভিযানে ৩২ জন নিহতের প্রমাণ পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) তদন্ত সংস্থা।
আর এ ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দীন খান আলমগীর, পুলিশ কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদ, হাসান মাহমুদ খন্দকারসহ ৯ জনকে আসামি করে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয়েছে, যার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আলোচিত শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের বেশির ভাগ ভুক্তভোগী হলেন হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মী ও সমর্থক। তদন্ত সংস্থা এটিকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকার শুরুতে দাবি করেছিল, শাপলা চত্বরের ঘটনায় ৬১ জন নিহত হয়েছেন।
কোনো কোনো পক্ষ এ ঘটনায় অনেক বেশি মৃত্যুর অভিযোগ এনেছিল। অন্যদিকে তৎকালীন সরকারি সূত্রে তখন বলা হয়েছিল যে ওই রাতে কোনো প্রাণহানি হয়নি, যদিও দিনের বেলায় সংঘর্ষে ১১ জন নিহত হওয়ার কথা জানায় তৎকালীন সরকার। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সম্প্রতি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ২০১৩ সালের মে মাসে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে ৫৭ জনের হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
২০২৬ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থাকে উদ্ধৃত করে গণমাধ্যমে বলা হয়, শাপলা চত্বরে ঘটনাস্থলেই ৩২ জন নিহত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য স্থানেও এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত মৃত্যুর প্রমাণ মিলেছে বলে জানানো হয়। ওই দিন রাতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে, সরাসরি গুলিবর্ষণ করে নিরস্ত্র মানুষের ওপর এই অভিযান চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে, যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়। সবচেয়ে বড় আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এই ঘটনায় তথ্য প্রকাশের জেরে মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খান ও নাসির উদ্দিন এলানকে মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। পরে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শাপলা চত্বরের ওই ঘটনার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া পুনরায় সামনে আসে।
শাপলা চত্বর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক আইজিপি, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ অন্যদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়েছে।
তা ছাড়া ওই অভিযানের সময় মিডিয়া ব্ল্যাক-আউট বা গণমাধ্যমকে প্রচার থেকে বিরত রাখা হয়েছিল এবং নিহতের সংখ্যা ও ঘটনার আসল চিত্র আড়াল করার অভিযোগ রয়েছে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে। তাই শাপলা চত্বরের ওই ঘটনাটিকে একটি ‘রাষ্ট্র স্পন্সরড সহিংসতা’ হিসেবে অনেক মানবাধিকারকর্মী ও বিশ্লেষক এরই মধ্যে মত দিয়েছেন।
শাপলা চত্বরের ওই ঘটনায় ২০১৩ সালের ৩ মে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বিভিন্ন দেশের দূতাবাস থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৎকালীন সরকারকে একটি চিঠি দেয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, আগামী দিনে যদি বিক্ষোভ হয়, তাহলে সরকারকে বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করা উচিত নয়। পাশাপাশি এই ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের ব্যবস্থা করতেও বলা হয়। আর অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তখনকার সরকারের প্রতি আহবান জানায়, যাতে পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়টি তদন্ত করতে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি অবিলম্বে গঠন করা হয়।
আইসিটির বর্তমান চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য অনুযায়ী, এই মামলার তদন্তকাজ শিগগিরই শেষ হবে। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৭ জুন দিন ধার্য আছে। সেদিন পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়া যাবে বলে তাঁরা আশা করছেন। হেফাজতে ইসলামের পাশাপাশি সচেতন দেশবাসী ও মানবাধিকারকর্মীদের চাওয়া শাপলা চত্বরের ওই ঘটনার সঙ্গে প্রকৃত জড়িতদের সঠিক তদন্তপূর্বক শনাক্ত করে উপযুক্ত বিচারের মুখোমুখি করা, যেন ভবিষ্যতে দেশে এ ধরনের নির্মম হত্যাযজ্ঞ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা না ঘটে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এ ধরনের ঘটনার কারণে দেশের ভাবমূর্তি যেন ক্ষুণ্ন না হয়।
লেখক : অধ্যাপক (আইন বিভাগ), ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য । সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন








